স্মার্টফোন আর ট্যাবলেটের এই যুগে বাচ্চাকে বই পড়ার অভ্যাস করানোর উপায় খোঁজা অনেক অভিভাবকের কাছেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলায় বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হলে শিশুর কল্পনাশক্তি, ভাষাজ্ঞান এবং মনোযোগ—সবকিছুরই দারুণ উন্নতি হয়। তবে জোর করে বা ধমক দিয়ে এই অভ্যাস গড়ে তোলা যায় না। প্রয়োজন সঠিক কৌশল, ধৈর্য এবং পরিবারের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। নিচে এমন কিছু কার্যকরী ও সহজ উপায় আলোচনা করা হলো যা আপনার সন্তানকে বইয়ের দুনিয়ায় নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
মূল বিষয়গুলো একনজরে

- প্রতিদিন ঘুমানোর আগে অন্তত ১৫ মিনিট গল্প বলার সময় রাখুন, এটি সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস।
- বাচ্চার বয়স অনুযায়ী ছবিওয়ালা, অডিও বা ইন্টারঅ্যাক্টিভ বই বেছে নিন।
- বাড়িতে একটি নির্দিষ্ট পড়ার কোণ তৈরি করুন যেখানে শুধু বই থাকবে।
- আপনি নিজে বই পড়ুন, কারণ বাচ্চারা দেখে শেখে বেশি।
- বই পড়াকে কখনো শাস্তি বা বাধ্যবাধকতা হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
- লাইব্রেরি বা বইমেলায় নিয়মিত যাওয়ার অভ্যাস করুন।
কেন বাচ্চাদের বই পড়া জরুরি?
বই পড়া কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মাধ্যম নয়, এটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের চাবিকাঠি। গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলা থেকে যারা বই পড়ে তাদের শব্দভাণ্ডার অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ হয়। American Academy of Pediatrics reading aloud to children বিষয়ে তাদের নির্দেশিকায় জানিয়েছে যে, শিশুদের উচ্চস্বরে বই পড়ে শোনানো তাদের মস্তিষ্কের ভাষা প্রক্রিয়াকরণ অংশকে সরাসরি সক্রিয় করে।
এছাড়া গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে নিজেকে মেলাতে গিয়ে বাচ্চাদের সহানুভূতি তৈরি হয়। তারা বুঝতে শেখে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাও বই পড়ার মাধ্যমে বাড়ে, যা বর্তমান ডিজিটাল যুগে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বয়স অনুযায়ী বই নির্বাচনের উপায়
ভুল বই দিলে বাচ্চা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাই বয়স অনুযায়ী বই বাছাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচের ছকটি আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে:
| বয়স | বইয়ের ধরন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ০-২ বছর | বোর্ড বুক, কাপড়ের বই, ছবিওয়ালা | রঙিন প্রাণীর ছবির বোর্ড বুক, ‘First Words’ সিরিজ |
| ৩-৫ বছর | ছবি বেশি, লেখা কম, ছড়া | সুকুমার রায়ের ছড়া, ঠাকুরমার ঝুলি (ছবি সংস্করণ) |
| ৬-৮ বছর | সহজ গল্প, কমিক্স, রূপকথা | গোয়েন্দা গল্প, ব্যাঙ্গাচি সিরিজ, ন্যান্টু গোয়েন্দা |
| ৯-১২ বছর | অ্যাডভেঞ্চার, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি | মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই, হুমায়ূন আহমেদের কিশোর উপন্যাস |
ছোটদের জন্য বোর্ড বুক
একদম ছোট বাচ্চারা বই ছিঁড়ে ফেলতে পারে। তাই মোটা পাতার বোর্ড বুক ব্যবহার করা নিরাপদ। এগুলো তারা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারে।
কিশোরদের জন্য সিরিজ বই
একটু বড় বাচ্চাদের কোনো সিরিজের প্রথম বইটি পড়িয়ে দিন। গল্পের পরবর্তী ঘটনা জানার কৌতূহলে তারা নিজেরাই বাকি বইগুলো খুঁজে নেবে।
বাচ্চাকে বই পড়ার অভ্যাস করানোর উপায়
এই অংশে আমরা মূল কৌশলগুলো ধাপে ধাপে আলোচনা করব। বাচ্চাকে বই পড়ার অভ্যাস করানোর উপায় হিসেবে নিচের কাজগুলো নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।
প্রথমত, ঘুমানোর আগের গল্প একটি অপরিহার্য রুটিন হওয়া উচিত। প্রতিদিন রাতে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ১৫-২০ মিনিট গল্প পড়ে শোনান। এতে বাচ্চা বইকে আরামের সাথে যুক্ত করবে।
দ্বিতীয়ত, বাচ্চাকে নিজে বই বাছাই করতে দিন। জোর করে কোনো বই ধরিয়ে দিলে তারা বিরক্ত হবে। বইয়ের দোকানে গিয়ে তাদের পছন্দের মলাট বা বিষয়বস্তু বেছে নিতে উৎসাহিত করুন।
তৃতীয়ত, গল্প পড়ার সময় গলার স্বর পরিবর্তন করুন। ভিলেনের গলা ভারী আর নায়কের গলা চনমনে করলে বাচ্চা গল্পের আবেগ বুঝতে পারবে এবং মনোযোগ ধরে রাখবে।
সতর্কতা: বই পড়াকে কখনো স্কুলের হোমওয়ার্ক বা শাস্তির সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। “তুমি দুষ্টুমি করেছ, তাই এখন এক ঘণ্টা বই পড়বে”—এমন কথা বললে বাচ্চা বইকে শাস্তি ভাবতে শুরু করবে।
বাড়িতে পড়ার পরিবেশ তৈরি করা

বাড়িতে যদি বই রাখার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকে, তবে বাচ্চার মনে বইয়ের গুরুত্ব তৈরি হয় না। ঘরের একটি শান্ত কোণে ছোট একটি র্যাক বা বাক্সে বাচ্চার বইগুলো গুছিয়ে রাখুন। সেখানে একটি আরামদায়ক কুশন বা মাদুর দিন, যেন বাচ্চা সেখানে বসে বা শুয়ে আরামে বই পড়তে পারে।
এই জায়গায় টেলিভিশন বা মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখুন। পরিবেশ যত শান্ত ও আকর্ষণীয় হবে, বাচ্চা তত বেশি সময় সেখানে কাটাতে চাইবে। বইয়ের র্যাকটি বাচ্চার নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি, যাতে সে নিজেই যখন খুশি বই বের করতে পারে।
অভিভাবকদের নিজেদের অভ্যাস বদলানো
বাচ্চারা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা বেশি অনুসরণ করে। আপনি যদি সারাদিন স্মার্টফোনে স্ক্রল করেন আর বাচ্চাকে বলেন বই পড়তে, তবে সে কখনোই শুনবে না। আপনাকেও বই পড়ার মডেল হতে হবে।
বাচ্চার সামনে বসে আপনি নিজে বই, পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ুন। দেখাবে যে বড়রাও বই পড়ে আনন্দ পায়। পরিবারে সবার জন্য একটি ‘পড়ার সময়’ নির্ধারণ করতে পারেন, যেখানে সবাই একসাথে বসে নিজেদের পছন্দের বই পড়বে।
প্রযুক্তি ও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বাচ্চার মনোযোগের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে বইয়ের মতো ধীর গতির মাধ্যমে তারা আগ্রহ হারায়। ইউটিউবের রঙিন ভিডিওর সাথে বইয়ের সাদাকালো পাতার প্রতিযোগিতা হলে বই হেরে যাবে। তাই স্ক্রিন টাইম কমানো অত্যন্ত জরুরি।
| সময় | স্ক্রিন ব্যবহার | বিকল্প কাজ |
|---|---|---|
| সকালে ঘুম থেকে উঠে | কার্টুন দেখা বন্ধ | ছবিওয়ালা বই দেখা |
| দুপুরে খাওয়ার পর | মোবাইল গেমস | অডিও বই শোনা |
| রাতে ঘুমানোর আগে | ট্যাবলেটে ভিডিও | বাবা-মায়ের সাথে গল্প পড়া |
মোবাইল বা ট্যাবলেট থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখতে হলে বিকল্প হিসেবে বইকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে অডিও বই বা ই-রিডার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে কাগজের বইয়ের বিকল্প নেই।
বই পড়াকে খেলায় রূপান্তর করা

বই পড়াকে যদি খেলার মতো উপস্থাপন করা যায়, তবে বাচ্চা দ্রুত আকৃষ্ট হবে। গল্প পড়ার পর বাচ্চাকে সেই গল্পের চরিত্র হয়ে অভিনয় করতে বলুন। এতে তাদের কল্পনাশক্তি বাড়বে এবং গল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হবে।
গল্পের শেষ না বলে থামিয়ে দিন, তারপর বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করুন— “তোমার কি মনে হয় এরপর কী হবে?” এভাবে তাদের চিন্তা করতে উৎসাহিত করুন। বই পড়া শেষ হলে ছোট কোনো পুরস্কার, যেমন পার্কে যাওয়া বা পছন্দের খাবার, দিতে পারেন। তবে পুরস্কার যেন বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
লাইব্রেরি ও বইমেলায় যাওয়া
বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে বইয়ের জগৎকে নিয়ে যাওয়া দরকার। স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে বাচ্চার নাম রেজিস্ট্রেশন করিয়ে দিন। সেখানে অনেক বাচ্চা একসাথে বই পড়ে, এই সামাজিক পরিবেশ তাদের উৎসাহিত করে।
বছরে অন্তত একবার বইমেলায় নিয়ে যান। মেলায় বইয়ের স্টল ঘুরে দেখা, লেখকদের সাথে কথা
শিশুর মনে পড়ার আনন্দ গেঁথে দিতে তাড়াহুড়ো করবেন না। আজই সন্ধ্যায় ওর পাশে বসে প্রিয় গল্পের একটা পাতা খুলুন, নিজের গলায় পড়ে শোনান। আপনার উষ্ণতা আর সময়ই ওকে অক্ষরের জগতে টেনে নেবে। ছোট্ট এই চেষ্টাটুকু ধরে রাখলে, একদিন দেখবেন সে নি
আরও পড়ুন
বাচ্চার পড়ার অভ্যাস তৈরি করার উপায়
বাচ্চার পড়ায় মনোযোগ বাড়ানোর উপায়: কার্যকর ৮টি কৌশল
